পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন চায় পিসিএনপি।

মেহেদী হাসান, রাঙামাটি প্রতিনিধি :
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সম্প্রতি গঠিত তিনটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিকে সাধুবাদ জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি)। একই সঙ্গে পাহাড় থেকে সশস্ত্র সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূল, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন, পাহাড়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাঙামাটি শহরের কাঁঠালতলীর মৃধা ভবনে পিসিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য হাবীব আজমের সঞ্চালনায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পিসিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান।
এ সময় পিসিএনপি রাঙামাটি জেলা সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম, সহসাধারণ সম্পাদক মাওলানা ইব্রাহিম, মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোরশেদা আক্তার, যুব পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুর হোসেন, পিসিসিপি রাঙামাটি জেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম তাজ, সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনসহ পিসিএনপি, পিসিসিপি, পিসিজেপি ও পিসিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে পিসিএনপি নেতারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নীতি নির্ধারণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকার যে তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, তা পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পাহাড়ি-বাঙালির সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখতে পারে। তারা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
তবে পিসিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের দীর্ঘ সময় পরও পাহাড়ে অস্ত্রের ব্যবহার, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাদের দাবি, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়। পিসিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, জেএসএস অস্ত্র ও সশস্ত্র তৎপরতা পুরোপুরি পরিত্যাগ না করেই পার্বত্য চুক্তির কথা তুলে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে। তারা পাহাড়ে চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সম্প্রতি শিশির চাকমার দেওয়া সংবাদ সম্মেলনেরও প্রতিবাদ জানায় পিসিএনপি। সংগঠনটির নেতারা বলেন, শিশির চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বসাধারণের প্রতিনিধি নন। তার বক্তব্যকে তারা জেএসএসের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করেন এবং ওই সংবাদ সম্মেলনের নিন্দা জানান।
এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনকে স্বপদে বহাল রাখার দাবিও জানানো হয়। পিসিএনপি নেতাদের দাবি, পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। পিসিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, চুক্তির বিভিন্ন বিষয় বাস্তবায়নের পরও পাহাড়ে সশস্ত্র তৎপরতা ও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এ কারণে বর্তমান বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানায় সংগঠনটি।
একই সঙ্গে জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া পাহাড়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে ‘লিগ্যাল টাস্কফোর্স’ গঠন, জেলা পরিষদের ন্যস্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগগুলো পুনরায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া, ১ শতাংশ উপজাতীয় কোটার পরিবর্তে পিছিয়ে পড়া সব জনগোষ্ঠীর জন্য ‘অনগ্রসর কোটা’ চালু এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে জনসংখ্যার অনুপাতে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
বিদেশি এনজিওগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তদারকির ব্যবস্থার দাবিও জানায় পিসিএনপি।
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে পিসিএনপির কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় গঠিত তিনটি জাতীয় কমিটির যেকোনো গঠনমূলক উদ্যোগে নাগরিক পরিষদ সহযোগিতা করবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন দাবি জানানোর পরও যদি সরকার পার্বত্য এলাকার স্থানীয়দের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে শিগগিরই পাহাড়ের সব জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে একদফা আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে। এ আন্দোলনের মাধ্যমে পুরো পার্বত্যাঞ্চল অচল করে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি।


