লামায় প্রায় ৪০ ইটভাটার মাটির জোগান, বর্ষাকালেও চলছে পাহাড় কাটা

নজরুল ইসলাম (লামা, বান্দরবান) প্রতিনিধিঃ
বান্দরবানের লামা উপজেলায় প্রায় ৪০টি ইটভাটার মাটির জোগান দিতে বর্ষাকালেও বড় বড় পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানে বেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহের দৃশ্য পাওয়া গেছে। কোথাও পাহাড়ের বড় অংশ কেটে ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও কাটা মাটি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নেই রয়েছে ৩৩টির বেশি ইটভাটা। এছাড়া ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে ২টি, গজালিয়া ইউনিয়নে ২টি, সরই ইউনিয়নে ১টি এবং লামা পৌরসভায় ১টি ইটভাটা রয়েছে। আরও ১–২টি ইটভাটা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে উপজেলায় ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৪০টি বা তারও বেশি হতে পারে। এসব ইটভাটায় মাটির চাহিদা মেটাতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে ধারণ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, বড় একটি পাহাড়ের ঢালে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। পাহাড়ের একটি অংশ কেটে খাড়া করে ফেলা হয়েছে এবং নিচে কাটা মাটির স্তূপ রয়েছে। বর্ষাকালে এভাবে পাহাড় কাটার ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও মাটির স্তর নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অতিবৃষ্টিতে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে পাহাড়ের গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—এসব পাহাড় কাটার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি বা ছাড়পত্র রয়েছে কি না। স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে পাহাড় কাটার কোনো অনুমতির তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুল হাসান সজীবের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি বান্দরবানে যোগদানের পর প্রায় তিন মাসে অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার দায়ে ২৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করেছি। এ সময়ে পাঁচটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের এই বক্তব্যের পরও লামার বিভিন্ন এলাকায় বর্ষাকালে এক্সকাভেটর দিয়ে পাহাড় কাটার দৃশ্য পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযান ও কার্যক্রম চলমান থাকার মধ্যেও কীভাবে বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পাহাড় কাটা বন্ধে আরও কার্যকর ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
এ বিষয়ে মানবতাবাদী পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক রুহুল আমিন বলেন, “পাহাড় নিধনে প্রতিযোগিতা দিয়ে পাহাড় কর্তন করে ইটভাটার মাটি সংগ্রহ করছে, খুবই নিন্দনীয়। এইটা বন্ধ করার জন্য কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষাকালে পাহাড় কাটার কারণে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে গেলে অতিবৃষ্টিতে ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাহাড়ের পাদদেশে বসতি, কৃষিজমি কিংবা সড়ক থাকলে এসব স্থাপনাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাদের প্রশ্ন, যদি পাহাড় কাটার অনুমতি না থাকে, তাহলে এক্সকাভেটর দিয়ে প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহের সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং এসব মাটি কোথায় যাচ্ছে—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে রয়েছে কি না।
লামা উপজেলায় প্রায় ৪০টি বা তারও বেশি ইটভাটা থাকায় এসব ভাটায় বিপুল পরিমাণ মাটির প্রয়োজন হয়। সেই মাটির জোগান দিতে যদি পাহাড় কাটা হয়ে থাকে, তাহলে ইট উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে পাহাড় ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কতটা পড়ছে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইটভাটা মালিক, মাটি সংগ্রহকারী ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।
তবে পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট ইটভাটা মালিকদের বক্তব্য এবং লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যুক্ত করে পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের চলমান কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট করা সম্ভব হবে।


