সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬, ঢাকা

শিক্ষা

লামায় ফলাফলে কোয়ান্টামের চমক, পিছিয়ে লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

নজরুল ইসলাম (লামা, বান্দরবান) প্রতিনিধিঃ

২০২৬ সালের মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি শাখার প্রকাশিত ফলাফলে বান্দরবানের লামা উপজেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। একদিকে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করে চমক দেখিয়েছে, অন্যদিকে লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি পুরো উপজেলায় সামগ্রিক পাসের হারও ৫০ শতাংশের সামান্য বেশি হওয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

১০ আগস্ট প্রকাশিত লামা উপজেলা পর্যায়ের ফলাফল অনুযায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি শাখা মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৩৫৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৬৭৯ জন। উপজেলায় সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ ৬৭৫ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। ফলে মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষায় কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের ৭৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭১ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। এই ফলাফল লামা উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা ফলাফল হিসেবে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে লামা উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩৮ জন। পাসের হার ৪৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ জন। অর্থাৎ সাধারণ এসএসসিতে বিদ্যালয়টির ৪৩ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

শুধু সাধারণ এসএসসি পরীক্ষাতেই নয়, এসএসসি ভোকেশনাল শাখাতেও দুই প্রতিষ্ঠানের ফলাফলে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। ভোকেশনালে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের ৬৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৫ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৪ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ জন।
বিপরীতে লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল শাখায় ১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৯ জন। পাসের হার ৪৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ অর্জন করেছে কোনো শিক্ষার্থীই।

সাধারণ এসএসসিতে দুই প্রতিষ্ঠানের পাসের হারের ব্যবধান প্রায় ৪৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ পয়েন্ট। ভোকেশনাল শাখাতেও ব্যবধান প্রায় ৪৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ পয়েন্ট।

এমন ফলাফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—একই উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার যেখানে ৯৪ শতাংশের বেশি, সেখানে লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাসের হার কেন ৪৭ শতাংশের নিচে?

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের মেধার ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান, নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষকদের একাডেমিক তদারকি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল বিশ্লেষণে তাই শিক্ষক সংকটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা কম থাকলে বিষয়ভিত্তিক নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে সহযোগিতা করার সুযোগও কমে যেতে পারে। তবে শিক্ষক সংকটের প্রকৃত অবস্থা এবং এর প্রভাব এবারের ফলাফলে কতটা পড়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের ফলাফল দেখাচ্ছে, পরিকল্পিত পাঠদান, নিয়মিত একাডেমিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবিড় নজর থাকলে লামার মতো উপজেলাতেও উচ্চ পাসের হার ও জিপিএ-৫ অর্জন করা সম্ভব।

তবে শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে দায়ী না করে লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল কেন এমন হলো, তার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। শিক্ষক সংকট থাকলে তা সমাধান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস, নিয়মিত অভিভাবক সভা এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লামা উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩৫৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৭৯ জন পাস করলেও ৬৭৫ জনই অকৃতকার্য হয়েছে। ফলে সামগ্রিক পাসের হার ৫০ দশমিক ১৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকা উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় একটি সরকারি ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে এ প্রতিষ্ঠানের কাছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশাও বেশি। ৮১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৩ জন অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং আগামী শিক্ষাবর্ষে ফলাফল উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন