বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকা

লাইফস্টাইল

‘আর কোন বৃদ্ধাশ্রম নয়’ সন্তানের ঘর হোক মা-বাবার শেষ আশ্রয়স্থল মো: আব্দুল আজিজ

আজ ১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬’ উদযাপিত হবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যুগান্তকারী এ সিদ্ধান্তের আলোকে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ১৯৯১ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

“মা-বাবা” পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর দুটি শব্দ। সন্তানের জীবনের প্রথম আলো, প্রথম শিক্ষক এবং নিরাপদ আশ্রয় হলেন তার পিতা-মাতা। শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত সন্তানকে মানুষ করতে মা-বাবা তাদের জীবনের সমস্ত সুখ, স্বপ্ন এবং উপার্জনকে নিঃশেষে বিলিয়ে দেন। কিন্তু কালের আবর্তে এবং আধুনিক সভ্যতার যান্ত্রিক প্রভাবে আজ আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধে চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। যে মা-বাবা নিজের জীবনের চেয়েও সন্তানকে বেশি ভালোবাসলেন, বার্ধক্যে উপনীত হয়ে সেই মা-বাবার স্থান অনেক সময় হচ্ছে চার দেয়ালের অবরুদ্ধ ‘বৃদ্ধাশ্রমে’। এটি একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক। প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সন্তানের ঘরকে মা-বাবার শেষ বয়সের পরম আশ্রয়স্থলে পরিণত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের অবস্থা

বাংলাদেশ বর্তমানে এক জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি ও গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু এর বিপরীতে প্রবীণদের সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তা ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠন, অতিরিক্ত ক্যারিয়ার-কেন্দ্রিক মানসিকতা এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে সমাজ থেকে শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার বোধ হারিয়ে যাচ্ছে।
আজকের বাংলাদেশে অনেক প্রবীণই চরম অবহেলা, একাকীত্ব এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক সন্তান নিজেরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও বৃদ্ধ মা-বাবাকে বোঝা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে, কিংবা ঘরের এক কোণে অবহেলায় ফেলে রাখছে। চিকিৎসার অভাব, পুষ্টিহীনতা এবং মানসিক নির্যাতন আজ অনেক প্রবীণের নিত্যসঙ্গী। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা আমাদের ঐতিহ্যগত পারিবারিক বন্ধন ও সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করছে।

প্রবীণদের সুরক্ষায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়: বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় প্রবীণদের সামগ্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এই লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি-

১. পারিবারিক সচেতনতা ও মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ: পরিবারই প্রবীণদের প্রথম এবং প্রধান আশ্রয়স্থল। শৈশব থেকেই সন্তানদের মধ্যে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিতে হবে। মা-বাবাকে সেবা করা কোনো করুণা নয়, বরং এটি সন্তানের পরম কর্তব্য—এই বোধ জাগ্রত করতে হবে।
২. আইনের কঠোর প্রয়োগ: বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ প্রণয়ন করেছে। এই আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে। এই আইনের যথাযথ এবং কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো সন্তান আইন ফাঁকি দিয়ে মা-বাবাকে অবহেলা করতে না পারে।

৩. জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার বাস্তবায়ন: সরকারের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালাকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে হবে। প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা, সরকারি হাসপাতালে আলাদা বুথ, এবং যাতায়াত ব্যবস্থায় বিশেষ ছাড় বা ভাড়ার সুবিধা প্রদান করা উচিত।

৪. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ: বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সাথে দুস্থ ও নিঃস্ব প্রবীণদের চিহ্নিত করে তাদের পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে।
৫. মানসিক ও বিনোদনমূলক সহায়তা: প্রবীণরা যাতে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ না করেন, সেজন্য সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রবীণ ক্লাব, লাইব্রেরি বা ডে-কেয়ার সেন্টারের মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে তারা সমবয়সীদের সাথে সময় কাটাতে পারেন।

বৃদ্ধ মা-বাবার সেবায় মহানবী (সা.)-এর বাণী ও ইসলামের নির্দেশনা: ইসলাম ধর্মে মা-বাবার মর্যাদা ও সেবাকে ইবাদতের সমকক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা নিজের ইবাদতের পরেই মা-বাবার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা বনী ইসরাইলের ২৩-২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানসূচক নরম কথা বলো।”

রাসূলুল্লাহ (সা.) মা-বাবার সেবার ব্যাপারে উম্মতকে কঠোর তাগিদ দিয়েছেন এবং এর অবহেলাকারীকে চরম হতভাগ্য বলেছেন। এই সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস নিচে উল্লেখ করা হলো-
জান্নাত লাভের সহজ মাধ্যম: এক বিখ্যাত হাদিসে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, “সে ধূলিসাৎ হোক, সে ধূলিসাৎ হোক, সে ধূলিসাৎ হোক।” জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! কে সে? তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে অথবা একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেল, অথচ (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।” (সহীহ মুসলিম)আল্লাহর সন্তুষ্টি মা-বাবার সন্তুষ্টিতে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “পিতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত এবং পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।” (জামে আত-তিরমিযী)

জিহাদের চেয়েও মা-বাবার সেবা উত্তম: এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। নবীজী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি মা-বাবা জীবিত আছেন?” সে বলল, হ্যাঁ। নবীজী বললেন, “তবে তাদের সেবার মাধ্যমেই তুমি জিহাদের সওয়াব অর্জনের চেষ্টা করো।” (সহীহ বুখারী)

মায়ের মর্যাদা সবার ওপরে: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার ভালো ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? নবীজী (সা.) বললেন, “তোমার মা।” লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? নবীজী বললেন, “তোমার মা।” লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? নবীজী বললেন, “তোমার মা।” চতুর্থবার জিজ্ঞেস করার পর নবীজী বললেন, “তোমার পিতা।” (সহীহ বুখারী) এই বাণীগুলো প্রমাণ করে যে, বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা করা ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি জান্নাত পাওয়ার অবধারিত শর্ত।

কোনো বৃদ্ধাশ্রম নয়, সন্তানের ঘর হোক মা-বাবার আশ্রয়স্থল: ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটির মধ্যেই এক গভীর বেদনা ও একাকীত্ব লুকিয়ে আছে। কোনো মা-বাবাই জীবনের শেষ দিনগুলো অচেনা, অজানা এক বৃদ্ধাশ্রমে কাটাতে চান না। সন্তানকে যে বুকে আগলে তারা বড় করেছেন, সেই সন্তানের ঘরের একটি ছোট কোণই তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বর্গ। বৃদ্ধাশ্রম কখনো পরিবারের বিকল্প হতে পারে না। সেখানে হয়তো চারবেলা খাবার এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা মিলতে পারে, কিন্তু সন্তানের হাতের ছোঁয়া, নাতি-নাতনিদের কোলাহল, আর পারিবারিক আবহ তৈরি করা সম্ভব নয়। একজন প্রবীণ মা বা বাবা শেষ বয়সে সন্তানের একটু ভালোবাসা, একটু কথা এবং পরম মায়ার কাঙাল হন।
সন্তানদের মনে রাখা উচিত, আজ তারা যেভাবে তাদের মা-বাবার সাথে আচরণ করছেন, ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের সন্তানরাও তাদের সাথে ঠিক একই আচরণ করবে। এটি প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম। তাই প্রতিটি সন্তানের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত—”আমার মা-বাবা কোনো বৃদ্ধাশ্রমে যাবেন না, আমার ঘরই হবে আমার মা-বাবার পরম নিরাপদ আশ্রয়স্থল।” যত কষ্টই হোক না কেন, মা-বাবাকে নিজের কাছে রেখে সেবা করার মাঝেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা ও বরকত নিহিত।

প্রবীণরা আমাদের সমাজের বোঝা নন, বরং তারা আমাদের আশীর্বাদ, অভিজ্ঞতার বাতিঘর এবং ছায়াবৃক্ষ। তাদের অবহেলা করে কোনো সমাজ বা জাতি কখনো প্রকৃত সুখে শান্তিতে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের অধিকার ও সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মহানবী (সা.)-এর পবিত্র বাণীকে বুকে ধারণ করে আমাদের প্রবীণ ও বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। আসুন, সমাজ থেকে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা চিরতরে মুছে ফেলি। প্রতিটি সন্তানের ঘর হোক মা-বাবার শান্তির নীড়, যেখানে তারা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সম্মান, ভালোবাসা এবং পরম মমতায় বেঁচে থাকবেন।
লেখক: সমাজচিন্তক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এ্যানভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন।