লামায় এডিবির অর্থায়নে ল্যাট্রিন নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ

নজরুল ইসলাম লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
বান্দরবানের লামা পৌরসভায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এর অর্থায়নে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এবং লামা পৌরসভার সহযোগিতায় পরিচালিত ল্যাট্রিন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, তালিকা পরিবর্তন এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের উপকারভোগী করার অভিযোগ উঠেছে। লিখিত অভিযোগ, সরেজমিন অনুসন্ধান এবং যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যদের বক্তব্যে প্রকল্পটি নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে লামা পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের একাধিক বাসিন্দা লিখিত অভিযোগ করেছেন। এছাড়া তারা এই প্রতিবেদকের ক্যামেরার সামনেও প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অযোগ্য ব্যক্তিদের উপকারভোগী করার অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের পরিবর্তে একই পরিবারের একাধিক সদস্য, আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বজনদের উপকারভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হয়েছেন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য ও এনসিপি প্রতিনিধি নাজমুল হাসান অভিযোগ করে বলেন, “আমরা যে তালিকা দিয়েছি, সেখানে থাকা কয়েকজনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় নেই। আবার বাইরে থেকে সুকৌশলে কিছু নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। একই পরিবারের ছয়জনের নাম প্রকাশিত তালিকায় এসেছে, অথচ এই ছয়টি নাম আমরা কমিটির পক্ষ থেকে দিইনি।”
একই ধরনের অভিযোগ করেন ১ নম্বর ওয়ার্ডের যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য ও জামায়াত প্রতিনিধি মোহাম্মদ ওয়াক্কাস। তিনি বলেন, “আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গে যে তালিকা প্রস্তুত করে জমা দিয়েছিলাম, সেটি পরিবর্তন করা হয়েছে। কীভাবে এবং কার মাধ্যমে এই পরিবর্তন করা হয়েছে, তা আমরা জানি না।”
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে একই পরিবারের দুই ভাই উপকারভোগীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন। এছাড়া হাসপাতালপাড়া এলাকায় প্রকাশিত তালিকায় লামা সদর ইউনিয়নের এক বাসিন্দার নামও পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পৌরসভার বাইরের একজন ব্যক্তি কীভাবে পৌরসভার প্রকল্পের সুবিধাভোগী হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
আরও একটি অসঙ্গতি পাওয়া যায় টিটিএন্ডডিসি এলাকায়। প্রকাশিত তালিকায় টিটিএন্ডডিসি এলাকার কোনো নাম না থাকলেও সরেজমিনে সেখানে প্রকল্পের আওতায় ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তালিকায় এলাকার নাম বা উপকারভোগীর তথ্য না থাকলেও কীভাবে সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলো।
এছাড়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের টিএন্ডটি পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি ল্যাট্রিন নির্মাণকাজ অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদার কাজ শেষ না করেই চলে গেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে লামা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা লামা পৌর প্রশাসকের সহযোগিতা নিয়েছি। প্রতিটি ওয়ার্ডে সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে একজন সরকারি কর্মকর্তা, একজন সাংবাদিক, বিএনপির একজন প্রতিনিধি, জামায়াতের একজন প্রতিনিধি, এনসিপির একজন প্রতিনিধি, পৌরসভার একজন প্রতিনিধি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি ছিলেন। কমিটির সদস্যরা তালিকা প্রস্তুত করে পৌর প্রশাসকের কাছে জমা দিয়েছেন এবং চূড়ান্ত তালিকায় তাদের স্বাক্ষর রয়েছে।”
টিএন্ডটি পাড়া এলাকায় কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “ওই স্থাপনাটি সরকারি জায়গায় নির্মাণ করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় আপাতত কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে পৌর প্রশাসক ও লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “এই প্রকল্পের তালিকা প্রকাশের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা। তাই তালিকা প্রকাশের পর সাত দিনের মধ্যে যে কেউ লিখিত অভিযোগ দিতে পারবেন। অভিযোগের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নাম বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীরা প্রকল্পের সম্পূর্ণ তালিকা পুনঃযাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।


