বমু খালে সেতু নেই, ১২ পাড়ার ৫ হাজার মানুষের দুর্ভোগচিনতাবাপাড়া থেকে লুলাইং—ঝুঁকি নিয়ে খাল পারাপার, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা

নজরুল ইসলাম,লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
একটি সেতুর অভাবে বছরের পর বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের চিনতাবাপাড়া, তলইপাড়া, লুলাইং, কচুছড়াপাড়া, তুলাতুলিপাড়া, ডেকিছড়াপাড়াসহ ১২টি পাড়ার ৫ হাজারের অধিক মানুষ। প্রায় ১৮০ ফুট প্রশস্ত বমু খালের ওপর কোনো স্থায়ী সেতু না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে খাল পারাপার করতে হচ্ছে এসব এলাকার বাসিন্দাদের।
স্থানীয়দের কাছে বমু খাল শুধু একটি খাল নয়; এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও যোগাযোগের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাতায়াত, বিদ্যালয়ে যাওয়া, বাজারে কৃষিপণ্য নেওয়া, রোগী হাসপাতালে পৌঁছানো কিংবা জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত কোথাও যাওয়ার ক্ষেত্রে এই খাল পার হতে হয়।
কিন্তু খালের ওপর স্থায়ী কোনো সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে একই ভোগান্তি চলছে। বর্ষা মৌসুমে খালের পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে এই দুর্ভোগ রূপ নেয় ঝুঁকিতে। তখন শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের খাল পারাপার নিয়ে তৈরি হয় বাড়তি উদ্বেগ।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা
বমু খালের তীরেই রয়েছে চিনতাবাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টিতে শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাদের একটি অংশ প্রতিদিন খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে।
শুষ্ক মৌসুমে পানির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। পানি বেড়ে গেলে শিশুদের নিরাপদে পারাপার নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসাইন বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বমু খালের ওপর সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। খালের পানি বেড়ে গেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বাড়ে। দ্রুত সেতু নির্মাণ হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।
স্থানীয় অভিভাবকদের দাবি, একটি দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগে থেকেই স্থায়ী সমাধান করা প্রয়োজন। কোমলমতি শিশুদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত কোনোভাবেই নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।
১২ পাড়ার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ
চিনতাবাপাড়া, তলইপাড়া, লুলাইং, কচুছড়াপাড়া, তুলাতুলিপাড়া, ডেকিছড়াপাড়াসহ ১২টি পাড়ার মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে বমু খালটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাদের অনেকের জীবিকা কৃষিনির্ভর। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে হলে এই পথ ব্যবহার করতে হয়। সেতু না থাকায় বর্ষায় পণ্য পরিবহনেও সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় ও শ্রম ব্যয় হয়।
একইভাবে অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার সময়ও সমস্যায় পড়তে হয় স্থানীয়দের। জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতু নির্মাণ হলে শুধু বর্ষাকালের দুর্ভোগই কমবে না; সারা বছরই যোগাযোগব্যবস্থা আরও সহজ হবে। ১২টি পাড়ার মানুষের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকার যোগাযোগ বাড়বে এবং কৃষিপণ্য পরিবহনেও সুবিধা হবে।
একাধিকবার হয়েছে মাপজোক
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মেনচিং মুরুং জানান, বমু খালের ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হচ্ছে। সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন ও মাপজোকও একাধিকবার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একাধিকবার মাপজোক ও প্রস্তাব তৈরির পরও কেন এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি? কবে নাগাদ প্রকল্পটি অনুমোদন পাবে এবং কবে বাস্তবে সেতুর কাজ শুরু হবে—এখন সেটিই তাদের মূল প্রশ্ন।
ডিপিপিতে পাঠানো হয়েছে প্রস্তাব
সেতু নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মঈন উদ্দিন বলেন, “এই সেতু নির্মাণের প্রস্তাব ডিপিপিতে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই এটি বাস্তবায়ন হবে।”
এখানে DPP-এর পূর্ণরূপ Development Project Proposal (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব)।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেতু নির্মাণের প্রস্তাব ডিপিপিতে পাঠানোর বিষয়টি স্থানীয়দের জন্য আশার খবর হলেও তারা এখন প্রস্তাবের বাস্তবায়ন দেখতে চান। তাদের দাবি, প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজ শুরু করতে হবে।
শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চান স্থানীয়রা
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সেতুর প্রয়োজনীয়তা নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা এই দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো হয়েছে এবং সেতুর সম্ভাব্য স্থানও পরিদর্শন করা হয়েছে।
এখন ডিপিপিতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়ার পর তাদের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। তবে অতীতের মতো শুধু আশ্বাস বা প্রস্তাবের মধ্যে যেন বিষয়টি আটকে না থাকে, সেটিই তাদের দাবি।
তাদের ভাষ্য, ৫ হাজারের বেশি মানুষের যোগাযোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বমু খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
দুর্ঘটনার আগে স্থায়ী সমাধানের দাবি
বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোত বাড়লে খাল পারাপারের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ছোট শিশু ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ থাকে সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তখন বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে এখনই নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে চিনতাবাপাড়া, তলইপাড়া, লুলাইং, কচুছড়াপাড়া, তুলাতুলিপাড়া, ডেকিছড়াপাড়াসহ ১২টি পাড়ার ৫ হাজারের অধিক মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের একটাই দাবি—ডিপিপিতে পাঠানো প্রস্তাব দ্রুত অনুমোদন করে বমু খালের ওপর সেতু নির্মাণের কাজ বাস্তবে শুরু করা হোক।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সেতুটি নির্মিত হলে শুধু একটি খালের ওপর যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হবে না; বরং দুর্গম এলাকার মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় আসবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।


