এক মাসে খুলনায় পুলিশের অভিযানে শতাধিক গ্রেপ্তার বিদেশি পিস্তল, রিভলবার, গুলি ও ককটেল উদ্ধার; হত্যা, কুপিয়ে জখম, গুলিবর্ষণ ও লাশ উদ্ধারে আলোচনায় খুলনা

ফাহিম ইসলাম -খুলনা জেলা প্রতিনিধিঃ
সেপ্টেম্বরের প্রথম দিন থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত এক মাসেরও বেশি সময়ে খুলনা মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার হয়েছে। মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি এ সময়ে খুলনার বিভিন্ন এলাকায় ঘটেছে হত্যা, ছুরিকাঘাত, কুপিয়ে জখম, গুলিবর্ষণ, পিটিয়ে হত্যা ও মরদেহ উদ্ধারের মতো একাধিক ঘটনা।
প্রকাশ্যে আসা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পৃথক অভিযানের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে খুলনা মহানগরে বিশেষ অভিযানে এক দফায় ৫৯ জন এবং এর আগে আরেক দফায় ৬৩ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শুধু ওই দুই দফা অভিযানের প্রকাশিত হিসাবেই ১২২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর বাইরে বিভিন্ন থানার নিয়মিত অভিযান, মাদকবিরোধী অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার, হত্যা মামলার আসামি এবং পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারের ঘটনা রয়েছে।
তবে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা জেলা পুলিশ ও কেএমপির সব থানার পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত গ্রেপ্তার তালিকা প্রকাশ না হওয়ায় এ সময়ের মোট গ্রেপ্তারের চূড়ান্ত সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া পৃথক অভিযানগুলোতেই শতাধিক গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
অস্ত্র উদ্ধারে একাধিক অভিযান
সেপ্টেম্বরজুড়ে খুলনা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ ও বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
১১ সেপ্টেম্বর নগরীর নিরালা এলাকার কাশেমনগর রোডে ডিবি পুলিশের অভিযানে আশরাফুজ্জামান জীবন নামে এক যুবককে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, এক রাউন্ড গুলি ও দুই হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য জানায় পুলিশ।
১৭ সেপ্টেম্বর রাতে লবণচরা থানার আমতলা দ্বিতীয় গলিতে অভিযান চালিয়ে ডালিম খান, রানা ও আব্দুল্লাহ আল নোমান ওরফে নয়নকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি ও তিন রাউন্ড সীসা গুলি উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়।
এরপর হরিণটানা এলাকায় পৃথক অভিযানে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি উদ্ধার করা হয়। আরেক অভিযানে একটি রিভলবারসহ ৪১টি তাজা কার্তুজ উদ্ধারের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এসব কার্তুজের মধ্যে পিস্তল, রিভলবার ও শর্টগানের কার্তুজ ছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
রূপসা ব্রিজ এলাকায় পিস্তল ও ককটেল উদ্ধার
২৯ সেপ্টেম্বর রাতে লবণচরা থানার রূপসা ব্রিজ এলাকার নিচে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি ও তিনটি ককটেল উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘাট মালিকদের কাছে চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও ছিল আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিশেষ অভিযানে ৫৯ জন গ্রেপ্তার
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে খুলনা মহানগরে বিশেষ অভিযান জোরদার করে কেএমপি। এক দফা অভিযানে নগরীর বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, খুলনা থানায় ১৩ জন, সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় ১৩ জন, লবণচরা থানায় ৬ জন, হরিণটানা থানায় ১ জন, খালিশপুর থানায় ১৬ জন, দৌলতপুর থানায় ৮ জন এবং ডিবি পুলিশের অভিযানে ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে একই ধারাবাহিক অভিযানে আরও ৬৩ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন অপরাধ, মাদক, পরোয়ানা ও অন্যান্য মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সোনাডাঙ্গায় ছুরিকাঘাতে যুবক হত্যা
৯ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকায় মুস্তাকিন নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে হত্যার ঘটনা ঘটে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি মোটরসাইকেলে করে আসা একদল ব্যক্তি তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং হত্যার কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
একই দিনে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার
৯ সেপ্টেম্বর খুলনার পৃথক দুটি স্থান থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বটিয়াঘাটার কাজীবাছা নদী থেকে রাকিব খান নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি এর আগে জেলখানা ঘাটের ট্রলার দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ ছিলেন।
অন্যদিকে ফুলতলা এম এম কলেজের দক্ষিণ পাশ থেকে ইয়ানুর গাজী নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দুই ঘটনায়ই মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট থানায় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়।
কয়রায় দুই জেলেকে কুপিয়ে জখম
১৫ সেপ্টেম্বর রাতে সুন্দরবনের কয়রা এলাকায় নৌকায় ঘুমন্ত অবস্থায় দুই জেলেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনা ঘটে।
আহত দুই জেলেকে প্রথমে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় পাঠানো হয়। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে জেলেদের নিরাপত্তা নিয়েও এ ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
আজমুল হত্যা: গ্রেপ্তার একাধিক
সেপ্টেম্বরের আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেন ওরফে আযম হত্যা।
হরিণটানা এলাকার একটি মেসে তাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান শুরু করে।
পরবর্তীতে মামলার একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে হাসনাত হাবিব রিফাত ও তারেক ওরফে রুবেলসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা ও জড়িতদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
হোটেল কক্ষে যুবকের মরদেহ
২২ সেপ্টেম্বর নগরীর খানজাহান আলী রোডের একটি আবাসিক হোটেল থেকে সোহেল রানা বাবু নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনায় তার কথিত স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি হত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু—তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ জানায়।
করিমনগরে বিউটিশিয়ানের মরদেহ
২৩ সেপ্টেম্বর নগরীর করিমনগর মসজিদ লেনের একটি ভাড়া বাসা থেকে মনি খান নামে এক বিউটিশিয়ানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে তদন্ত শুরু হয়।
টুটপাড়ায় বাড়িতে গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুর
২৫ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর টুটপাড়া এলাকায় একটি বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
ঘটনাস্থলে একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর, বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ অভিযান চালায়। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়।
রূপসায় গুলিবিদ্ধ ও কুপিয়ে জখমের চিহ্নসহ লাশ
২৮ সেপ্টেম্বর সকালে রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের ইলাইপুর-মোমিনবাগ এলাকার একটি মাছের ঘের থেকে বাপ্পি ওরফে কলম বাপ্পি নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহে গুলির চিহ্নের পাশাপাশি মাথা ও কপালে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড কি না এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—তা তদন্ত করছে পুলিশ।
লবণচরা ও হরিণটানায় অস্ত্রের একাধিক চালান
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে লবণচরা ও হরিণটানা এলাকায় একাধিক অভিযানে বিদেশি পিস্তল, রিভলবার, ম্যাগাজিন ও বিপুলসংখ্যক গুলি উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
পুলিশের এসব অভিযান থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, নগরীর বিভিন্ন অপরাধী চক্রের কাছে অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি রয়েছে এবং এসব অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মাদকবিরোধী অভিযানও জোরদার
অস্ত্রের পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়েছে পুলিশ ও ডিবি। নিরালা এলাকায় দুই হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
২৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধ ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদক উদ্ধারের তথ্যও জানায় কেএমপি।
এক মাসে খুলনার অপরাধচিত্র
১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খুলনা মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের ধরন ছিল বহুমুখী।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—*
– হত্যা ও হত্যাচেষ্টা
– ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে জখম
– গুলিবর্ষণ
– গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার
– পিটিয়ে হত্যা
– হোটেল ও বাসা থেকে মরদেহ উদ্ধার
– চাঁদাবাজির অভিযোগ
– অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার
– ককটেল উদ্ধার
– ইয়াবাসহ মাদক উদ্ধার
– পরোয়ানাভুক্ত ও মামলার আসামি গ্রেপ্তার
– বিশেষ অভিযান ও চেকপোস্টে আটক
পুলিশের অভিযান অব্যাহত
খুলনা মহানগর পুলিশ ও জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, মাদক, সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসানো, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি এবং বিভিন্ন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নগরীর লবণচরা, হরিণটানা, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, দৌলতপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান বাড়ানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে অক্টোবরের প্রথম তিন দিন পর্যন্ত খুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যেমন বেড়েছে, তেমনি হত্যা ও সহিংসতার একাধিক ঘটনায় নগর ও জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত পৃথক অভিযানের হিসাবেই শতাধিক গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেলেও পুরো সময়ের সমন্বিত সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত মোট গ্রেপ্তারের চূড়ান্ত সংখ্যা বলা যাচ্ছে না।
খুলনা জেলা ও মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি সাম্প্রতিক হত্যা ও সহিংসতার ঘটনাগুলোর রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দিকেই এখন নজর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।


